আর্থিকখাতের শৃঙ্খলা আনায়নে সুশাসন আবশ্যক

ডিসিসিআই সেমিনারে বক্তারা

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃসংষ্কার ও ব্যবসা গুটিয়ে নেয়া এবং স্টেকহোল্ডারদের উপর এর প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ তারিখে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

সেমিনারের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ওসামা তাসীর বলেন, আমাদের অর্থনীতির ক্রমবিকাশের পাশাপাশি আর্থিকখাতের প্রতিষ্ঠানসমূহের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, একইসাথে এখাতের সংষ্কার এবং আর্থিক সেবার পরিধিও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, আর্থিকখাতের এ উন্নয়নের পরও বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে এখনও নানাবিধ সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে এবং এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতা, পর্যবেক্ষনের সীমাবদ্ধতা, ঋণ প্রদানে অনিয়ম ও ঋণ আহরণের দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়সমূহ অন্যতম। ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, খেলাপী ঋণের উচ্চহার আমাদের আর্থিকখাত ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। তিনি মনে করেন, স্থায়ী আমানতের বিপরীতে মুনাফার উচ্চহারের কারণে ঋণের সুদের হার কমানো যাচ্ছে না এবং এর ফলে বেসরকারীখাতে ঋণ প্রবাহ কমে গেছে ও বেশিহারে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে আমাদের এসএমইখাতের উদ্যোক্তাবৃন্দ। এজন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নজারদারি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার সংষ্কার এবং ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর রিস্ট্রাকচারিং অথরিটি’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব করেন।

প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে ড. মসিউর রহমান আর্থিকখাতের বিশ^াসযোগ্যতা যেন না হারায়, সেদিকে সকলকে যতœবান হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সকলকে সার্বিক দিক বিবেচনা করে সতর্কতার সাথে বিনিয়োগের পরামর্শ প্রদান করেন। এছাড়াও তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহে অডিট পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতিনিয়ত আভ্যন্তরীন ও তৃত্বীয় পক্ষের মাধ্যমে অডিট পরিচালনার উপর জোরারোপ করেন। তিনি বলেন, আমাদের পুঁজিবাজারে ভালো প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত শেয়ার নেই, যার কারণে আমরা অল্পকিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের উপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে তিনি উৎপাদনশীলখাতে আরো বেশি হারে বিনিয়োগ এবং ভালো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার প্রস্তাব করেন। তিনি বিদ্যমান নীতিমালার সংষ্কার ও আধুনিকায়ন এবং নীতিমালার ধারাসমূহের অস্পষ্টতা দূরীকরণের উপর গুরুত্বারোপ করেন।

আইডিএলসি ফিন্যান্স লিমিটেড-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান এবং আরএসএ কনসালটিং পার্টনার্স-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও দি সিটি ব্যাংক লিমিটেড’র প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

আইডিএলসি ফিন্যান্স লিমিটেড-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ প্রদান নিরুৎসাহিত করতে পুঁিজবাজারে বন্ড মার্কেট চালু করার প্রস্তাব করেন। তিনি খেলাপী ঋণের প্রবনতা কমানোর জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে কর্পোরেট গর্ভানেন্স বাড়ানো, বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানো, খেলাপী ঋণে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিতকরনের উপর জোরারোপ করেন। সোহেল আর কে হোসেন বলেন, আর্থিক খাতের বিদ্যমান সমস্যা মোকাবেলায় দূর্বল ব্যাংকসমূহের একত্রীতকরন, বাংলাদেশ ব্যাংক কে আরো স্বাধীনতা প্রদান, দূর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনঃগঠন, মূলধন অনুপাতের পর্যাপ্ততা বাড়ানো, এ্যাডভান্স অন ডিপোজিট (এডি)’র অনুপাত না ভঙ্গ করা প্রভৃতি বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি খেলাপী ঋণ আদায়ে আইনি ও কাঠামোগত দূর্বলতা দূর করার ওপর জোর দেন, যা কিনা সকল লিকুইডেশনের জন্যও প্রয়োজনীয়। তিনি খেলাপী ঋণ কমাতে ‘ডিস্ট্রেসড এ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানী’ স্থাপনের সুপারিশ করেন।

নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট-এর এ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড-এর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, বাংলাদেশ ব্যাংক এর মহাব্যবস্থাপক ড. মোঃ কবির আহমেদ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন-এর পরিচালক মোঃ আবুল কালাম অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা ভাল কর্পোরেট গভার্নেন্স, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিকতর পর্যবেক্ষণ, কোম্পানী আইনের বাস্তবায়ন, আর্থিকখাতের পুনঃসংষ্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা, আস্থা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান আর্থিক মামলা নিরসনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবহার করার উপর জোরারোপ করেন।

মুক্ত আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এম এস সেকিল চৌধুরী, প্রাক্তন সহ-সভাপতি এম আবু হোরায়রাহ, প্রাক্তন পরিচালক এ কে ডি খায়ের মোহাম্মদ খান এবং মেজর (অবঃ) ইয়াদ আলী ফকির, আইপিডিসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল ইসলাম, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়য়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম, পূবালী ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আহসান উল্ল্যাহ, ইউনাইটেড ফিন্যান্স লিমিটেড’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইসার তামীজ আমিন, ইবিএল সিকিউরিটিজ লিমিটেড’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ সায়েদুর রহমান, এনডিবি ক্যাপিটাল লিমিটেড’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক কান্তি কুমার সাহা, ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর পরিচালক মোহাম্মদ আলী, এফসিএ প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা একটি সুশৃঙ্খল আর্থিক খাতের জন্য যথাযথ পর্যবেক্ষণ নীতিমালা সংস্কার, নিয়মিত অডিট, ভাল ভাল ঋণ গ্রহীতা বাছাই করে ঋণ প্রদান করা ইত্যাদী বিষয়গুলোর উপর গুরুত্বারোপ করেন।

ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি ওয়াকার আহমেদ চৌধুরী সমাপনী বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, আর্থিকখাতের শৃঙ্খলা আনায়নে ঋণ আদায়ে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়নের উপর গুরুত্বারোপ করেন।

ডিসিসিআই সহ-সভাপতি ইমরান আহমেদ, পরিচালক ইঞ্জিঃ আকবর হাকিম, আশরাফ আহমেদ, এনামুল হক পাটোয়ারী, কে এম এন মঞ্জুরুল হক, ইঞ্জিঃ মোঃ আল আমিন, শামস মাহমুদ এবং প্রাক্তন সভাপতি আর মাকসুদ খান প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

আরো দেখাও

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close