পাবজি খুলে দেয়ায় স্বার্থের গন্ধ ?

বিশেষ প্রতিনিধি : পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি বিভাগের আবেদনে বিশ্বজুড়ে আলোচিত অনলাইন গেইম ‘প্লেয়ারআননোনস ব্যাটলগ্রাউন্ড’ (পিইউবিজি) বাংলাদেশে বন্ধ করার পর আবার খুলে দেওয়া হয়েছে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা শুক্রবার বিকালে এক ফেইসবুক পোস্টে গেইমটি বন্ধ করার তথ্য জানানোর পর রাতে আরেক পোস্টে তা খুলে দেওয়ার কথা জানান ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

রাত ১০টার দিকে দেওয়া এক পোস্টে মন্ত্রী লেখেন, “PUBG ব্যবহারকারী যারা এটি ব্লক করায় নাখোশ ছিলেন তারা জেনে খুশি হবেন যে এটি আর ব্লক করা নেই।”

পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাফা জব্বার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকার কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তাই গেইমটি খুলে দেওয়া হয়েছে।’

জোড়ালো ক্ষতিকর কারণ দেখিয়ে পাবজি গেম বন্ধ ঘোষণার পর পুনরায় গেমটি পুনরায় চালু করা হলো।

মন্ত্রী বলেছেন, পর্যালোচনা কমিটিতে বিশ্লেষণ করে জানা গেছে এই গেম যতটা ক্ষতিকর মনে করা হচ্ছে, ততটা ক্ষতিকর না ‘ ।

আর এই কমিটিতে সাইবার ক্রাইমের কোনও বিশ্লেষক ছিলেন কিনা সে বিষয়ে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিভাবকদের কেউ ছিল কি না, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কেউ ছিল কি না এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনোও যথাযথ তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনটাই উদ্বেগ জানিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞরা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ খেলায় এবং এটিতে হিংস্রতার প্রভাবে কিশোর ও যুব সমাজ ক্রমাগত মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ঘটছে নানাবিধ দুর্ঘটনা।

এ বছর যে কয়টি গেম আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ফোর্টনাইট। পাবজির থেকেও বেশি জনপ্রিয় হয়েছে এটি। এর জনপ্রিয়তার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে।

প্রায় সব প্ল্যাটফর্মের জন্য গেমটি উন্মুক্ত করার কারণেই মূলত এটি বেশি জনপ্রিয় হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের জন্য কিছুটা দেরিতেই এসেছিল গেমটি। আর এই সুযোগ নিয়েছে পাবজি।

মজার বিষয় হলো এপিক গেমসে ৪০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে টেনসেন্টের। টেনসেন্টই পাবজির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সমস্ত প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৫০ মিলিয়ন বিক্রির মাধ্যমে ‘পাবজি’ সর্বকালের সেরা বিক্রিত গেমগুলোর অন্যতম। পাবজি যারা খেলেন তাদের ৮% ভারতের, ১১% যুক্তরাষ্ট্রের এবং ৩৩% চীনের লোকজন।

চোখ কপালে উঠে যেতে পারে পাবজির আয় এর পরিমাণ জেনে।প্রতিদিন এই গেম থেকে ভারতীয় মুদ্রায় ৪ কোটি ৮৪ লক্ষ ৯১ হাজার ৮২০ রুপি আয় করে থাকে। এবং এটা সত্যিকার অর্থে অনেক বড় অঙ্কের আয়। যা পাবজি প্রতিদিন গেম খেলানোর মাধ্যমে উপার্যন করছে।

প্রায় ৩০ মিলিয়ন খেলোয়ার প্রতিদিন পাবজি খেলেন। এবং আরও ২০০ মিলিয়ন নিবন্ধিত খেলোয়ার রয়েছে পাবজি গেমের।

এছাড়াও, উইন্ডোজ সংস্করণটি স্টিমের একই সময়ে খেলা গেইমের খেলোয়াড়ের সংখ্যা অনুযায়ী শীর্ষস্থানে রয়েছে, যা এই প্ল্যাটফর্মের সর্বকালের সর্বোচ্চ।

প্লেয়ার আননোন ব্যাটেল গ্রাউন্ড গেইমটি দিয়ে ২০১৮ সালে পাবজি কর্পোরেশন আয় করেছে ৯২০ মিলিয়ন ডলার বা ৯২ কোটি ডলার।

এর মধ্যে তাদের লাভ ছিলো ৩১১ মিলিয়ন ডলার বা ৩১ কোটি ১০ লাখ। ভিডিও গেইম ইন্ডাস্ট্রির বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়াল আহমাদ এক টুইট পোস্টে এসব পরিসংখ্যান জানিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, গেইমটির পিসি সংস্করণ থেকে আয় হয়েছে ৭৯০ মিলিয়ন ডলার (৭৯ কোটি ডলার)। মোবাইল সংস্করণে আয় হয়েছে ৬৫ মিলিয়ন সাড়ে ৬ কোটি। কনসোল থেকে আয়ের পরিমাণ ৬০ মিলিয়ন বা ৬ কোটি।

পিসির চেয়ে মোবাইল সংস্করণে আয়ের পরিমাণ অনেক কম। এর কারণ হিসেবে আহমাদ জানিয়েছেন, পাবজির মোবাইল সংস্করণটি তৈরি করে বাজারে ছেড়েছে টেনসেন্ট, পাবজি কর্পোরেশন নয়। তাই শুধু বার্ষিক লাইসেন্স ফি ও টেনসেন্টের আয়ের ভাগ পায় পাবজি করর্পোরেশন।

এছাড়া চীন সরকার গেইমটির মোবাইল সংস্করণ আনার অনুমতি দেয়নি। তবে চীনের বাজারে মোবাইল সংস্করণ প্রবেশ করতে না পারলেও এশিয়া থেকে মোট আয়ের ৫৮ শতাংশ আয় করেছে পাবজি। এছাড়াও, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও বিশ্বের বাকি দেশ থেকে আয় হয়েছে পাবজি কর্পোরেশনের।

যেকোনো দক্ষতার খেলোয়াড়ই খেলতে পারে এবং পুনরায় খেলার যোগ্য একটি গেম। অন্যান্য সুনাম মধ্যে এই গেমটি বেশ কয়েকটি গেম অফ দ্য ইয়ার নমিনেশন পেয়েছে, এবং যুদ্ধ রয়্যাল গেইমস জগতের সংজ্ঞাগত খেলা হিসেবে গ্রীন বিবেচনা করেছেন।

অনেক অন্যান্য ভিডিও গেম, পিইউবিজি এর সাফল্যের ধারাবাহিকতায়, যুদ্ধ রয়্যাল শৈলী মোড যুক্ত করেছে, তাছাড়াও একাধিক ক্লোন প্রাথমিকভাবে চীনের বাইরে তৈরি হয়েছে।

পিইউবিজি কর্পোরেশন বেশ কয়েকটি ছোট প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছে এং দর্শকদের খেলাটি সম্প্রচারে সাহায্য করার জন্য ইন-গেম সরঞ্জামগুলি চালু করা হয়েছে, যাতে তারা একটি জনপ্রিয় অনলাইন স্পোর্টস হয়ে উঠতে চাইবে।

বাংলাদেশ এবং ভারতের প্রেক্ষাপটে পাবজি পিসি সংস্করণের থেকে মোবাইল সংষ্করণের খেলোয়ারের সংখ্যা অনেক বেশি।

এর মূল কারণ হচ্ছে মোবাইলের মতো পোর্টেবিলিটি পিসিতে না পাওয়া, এছাড়াও পিসি সংষ্করণটি ৩০ মার্কিন ডলার দিয়ে কিনে খেলতে হলেও মোবাইল সংস্করণটি ফ্রিতেই গুগল প্লেস্টোর এবং অ্যাপল স্টোর থেকে ডাউনলোড করে খেলা যায়। আর তাই বাংলাদেশে পাবজি মোবাইল প্লেয়ারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে একটু বেশি।

অনলাইনের এক প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রতি মাসে ২২৭ মিলিয়ন মানুষ পাবজি খেলে এবং প্রতিদিন ৮৭ মিলিয়ন মানুষ এই গেমটি খেলে। তথ্য বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, এখন পর্যন্ত ৫০ মিলিয়নেরও বেশি এই গেমটি বিক্রি হয়েছে।

পাবজি রেকর্ড করেছে পাবজি বর্তমানে সারা বিশ্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ এককালীন খেলোয়ারদের কারণে রেকর্ড করেছে। অনলাইনে ১.৩ মিলিয়ন খেলোয়ার একই সময়ে পাবজি খেলে।

কত মানুষ পাবজি (PUBG) গেমটি খেলে:
২০১৮ সালের ২০ জুনের সামারি অনুসারে মাসিক গড় প্রায় ২২৭ মিলিয়ন ও দৈনিক প্রায় ৮৭ মিলিয়ন লোকেরা বর্তমানে গেমটি খেলে। প্রায় বাংলাদেশের ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের খেলে প্রতিদিন।

পাবজি গেম এ বিশ্ব রেকর্ড:
২০১৭ সালে মার্চ 32 সিম নামক একটি প্লাটফর্মে গেমটি যখন প্রকাশ করা হয় তখন এক মাসের মধ্যে দুই মিলিয়ন কপি বিক্রি করা হয়। পাবজি গেমটি বিশ্বের সবথেকে বেশি বিক্রি করা গেম।

ভার্চুয়াল ব্যান্ডেনা কি:
যে কোন গেম বের হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকে চাইলে গেমটিকে ফ্রি অর্ডার করা যায় । পাবজি গেমটি বের হওয়ার কয়েক মাস আগে যারা অর্ডার করেছিলেন তাদেরকে পাবজি’র পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে একটি ভার্চুয়াল ব্যান্ডেনা।

গেমের ভিতরে ভার্চুয়াল ব্যান্ডেনা ব্যবহার করতে পারবে ইউজাররা। পাবজি এতই পপুলার হয়ে গিয়েছিল যে অনেক মানুষ আছে যারা এটি ১ হাজার ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রাই প্রায় ৭২ হাজার টাকা ! এটাকে অরিজিনাল প্রি-অর্ডার ভার্শন এর সাথে দেয়া হচ্ছিল। দিয়ে ভার্চুয়াল ব্যান্ডেনা কিনে গেমের ভিতর শুধু ব্যবহার করে।

উইনার উইনার চিকেন ডিনার এর প্রকৃত অর্থ:
এই শব্দগুলোর সাথে অতীতের মহামন্দার সম্পর্ক রয়েছে। যেখানে মানুষ লুডুর ছক্কার উপরেও বাজি ধরতেন। যে জিতে যেতো , তার জন্য চিকেন ডিনারের ব্যবস্থা হতো। সেখান থেকেই এই কথার উৎপত্তি।

২০১৮ সালে পাবজি করপোরেশন ২ মিলিয়ন ডলার কিছু দাতব্য সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে দান করেছে।

যদিও একদিকে বর্তমানে পাবজির উন্মত্ততা চলছে, যেখানে গা ভাসিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু অন্যদিকে অনেকে খুব খারাপভাবে এই গেমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। এবং এর প্রভাবে মৃত্যুর মতো ভয়াবহ বেশ কিছু দুর্ঘটনাও ঘটেছে।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে একসাথে সব থেকে বেশি PUBG গেম খেলার রেকর্ড রয়েছে:
জেনে অবাক হওয়ার মত কথা, এটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রায় ১৩ লক্ষ ৪২ হাজার ৫৮৭ ইউজার ইন্টারনেটে খেলে বিশ্ব রেকর্ড করেছে। এই বিশ্ব রেকর্ড আগে ছিল DOTO 2 গেমের। PUBG সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

এই গেমের নাম পাবজি (PUBG) হল কেন:
এ গেমটি সকল খেলোয়াড় রা নিজের নাম না প্রকাশ করে গেমটি খেলতে পারে। যে কোন মানুষ চাইলে নিজের নামের বদলে যেকোন নাম ব্যাবহার করে গেমটি খেলতে পারে। আর এই সূত্র ধরে গেম এর নামকরণ করা হয় প্লেয়ারআননোওন’স ব্যাটলগ্রাউন্ড অর্থাৎ PUBG সম্পূর্ণ নাম হয়। Player Unkownsn’s Battleground

এই গেমের অ্যাডভার্টাইজমেন্ট:
পাবজি গেমের প্যারেন্ট কোম্পানি পাবজি ফর পিসি এবং কনসোল এর জন্য এক পয়সাও অ্যাডভার্টাইজমেন্ট খরচ করেনি।

শুনে অবাক হয়ে যেতে হয় শুধুমাত্র মুখের কথাতেই এই গেম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ও এই গেমের জনপ্রিয়তা হয়ে যায় আকাশচুম্বী। তাই বলা হয় কোন অ্যাডভার্টাইজমেন্ট এর প্রয়োজন পড়েনি।

আবার অন্য দিক থেকে বলা যায় পাবজি মোবাইল হলো ভারতে প্রথম এমন মোবাইল গেম যার অ্যাডভার্টাইজমেন্ট দেখানো হয়েছিল ভারতীয় টেলিভিশনে । এটা থেকেই বোঝা যায় এই গেমের জনপ্রিয়তা ঠিক কতটা।

এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘টেনসেন্ট গেম’ নামে একটি গেম ডেভলপার সংস্থা অনলাইনে পাবজি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। প্রতিযোগিতা জিতলে পাওয়া যাবে ১ কোটি টাকা। নাম নথিভুক্ত করার জন্য কোনও ফি দিতে হবে না। ২০ লেভেল না হলে নাম নথিভুক্ত করা যাবে না।

জানা যায়, পাবজি খেলায় যদি কোনও প্লেয়ার ভিন্ন সফ্টওয়্যার কিংবা অন্য কোনো সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে কিংবা চালাকি করে জেতার জন্য জচ্চুরির পন্থা অবলম্বন করে, তাহলে সেই প্লেয়ারের আইডিটি ১০০ বছরের জন্যও ব্যান করে দিতে পারে।

জানা যায়, পাবজি প্রায় ৩৫০০ জন খেলোয়াড় এর ওপর ১০ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

“Tencent Games” নামক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তৈরিকৃত এই গেমটি শুধুমাত্র গুগল প্লে স্টোরেই ১০০ মিলিয়নেরও বেশিবার ডাউনলোড হয়েছে। বিগত এক বছরে এর আয় প্রায় ১৩৬% বেড়েছে।

পাবজি গেম বানিয়ে এক বছরে ৯২ কোটি ডলার আয় করেছে।

খেলাটিতে, একশজন খেলোয়াড় একটি দ্বীপে প্যারাসুট দিয়ে নামে এবং বিভিন্ন অস্ত্র-সরঞ্জাম দিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে হয়।ম্যাপের বিভিন্ন স্থান হতে অস্ত্র-সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে হয়।

ম্যাপের সেইফ জোনের আকার সময়ের সাথে সাথে ছোট হতে থাকে, খেলোয়াড়দের একে অন্যকে সাক্ষাৎ যুদ্ধ করানোর জন্য। নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে লাস্ট ম্যান স্ট্যাডিং হিসেবে যেই থাকে সেই হয় বিজয়ী।

এই পাবজি গেমের প্রভাবে অল্পবয়সীদের মধ্যে বাড়ছে হিংসা। ভার্চুয়াল জগতের মোহে তারা সরে যাচ্ছে বাস্তবতা থেকে।

এই অভিযোগে এর আগেও বিশ্বের একাধিক দেশে নিষিদ্ধ হয়েছে পাবজি। এবার সেই দেশগুলোর তালিকায় যোগ হয়েছে জর্ডানের নাম। ক্ষতিকর প্রভাবের কারণেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই অনলাইন গেম।

জর্ডানের টেলিকম নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের দাবি ব্যবহারকারীদের ওপর কু-প্রভাবের জেরেই সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে পাবজি গেম।

সংবাদমাধ্যম জি নিউজের খবরে বলা হয়, জর্ডানে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল পাবজি খেলা। বিশেষ করে দেশের যুবসমাজের মধ্যে এই গেমের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। এই নিয়ে এর আগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল সেই দেশের টেলিকম কর্তৃপক্ষ।

জর্ডানের মনোবিদদের দাবি, খেলার সময়ে অন্য খেলোয়াড়দের নৃশংসভাবে হত্যা করাই এই গেমের নিয়ম। এই ধরনের গেম-প্লে অল্পবয়সীদের মধ্যে হিংসার জন্ম দিতে পারে। আর এই কারণেই পাবজি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর আগে ইরাক, চীন, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান এবং ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ইতোমধ্যে এই গেইম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে এই গেইমে আসক্তি তৈরি হওয়ায় তরুণরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিভাবকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেটি বন্ধ করার জন্য বিটিআরসিকে বলেছিল পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি বিভাগ। তাদের আবেদনে গেইমটি ডাউনলোড করার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল বিটিআরসি।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘অভিভাবকরা চাইলে নিজেরাই তাদের ছেলে-মেয়েদের এই গেইম খেলা বন্ধের ব্যবস্থা করতে পারেন।’

দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি ব্লুহোলের তৈরি এই মাল্টিপ্লেয়ার গেইম সংক্ষেপে পাবজি নামেই পরিচিতি। এই গেইমে আসক্তির ফলে কিশোর-তরুণদের মধ্যে বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে আলোচনা হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই।

পাবজি গেমের ক্ষতিকর দিক:
দ্রুত জনপ্রিয়তার কারণে পাবজি গেমটি একদিকে যেমন আলোচিত হচ্ছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় গেমটি সমালোচিত হচ্ছে। কয়েকটি দেশে গেমটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং আরো কিছু দেশেও এই গেম নিষিদ্ধ হওয়ার আশংকা রয়েছে।

কেবলমাত্র বিনোদনের জন্য এই গেমটি খেলা হলে এটা নিয়ে কারো মাথাব্যথা থাকত না। কিন্তু গেমটি যেভাবে মানুষজনকে আসক্ত করছে, সেটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পাবজি একটা চমৎকার গেম, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু গেমটিতে আসক্তি একজন মানুষের যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করে, এতেও কোনো সন্দেহ নেই।

কোন কিছুতেই আসক্তি ভালো জিনিস নয়, পাবজির ক্ষেত্রেও এটা সত্য। আর শুধু আসক্তিই নয়, পাবজি গেমটির আরো কিছু ক্ষতিকর দিক রয়েছে যা আমাদের সবারই জানা উচিত।

তো এবার চলুন দেখে নেয়া যাক গেমটির খারাপ দিকগুলি যা থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে:

চরম সহিংসতা:
অন্যান্য অনেক ভিডিও গেমের মতো পাবজি গেমটার বিরুদ্ধেও সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে চীনে গেমটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে অনেক আগেই। আর সম্প্রতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে নেপালে। এর আগে ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান এবং ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ইতোমধ্যে এই গেইম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গেমটির অত্যধিক সহিংসতা গেমারকে আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে। হিংসাত্মক কার্যক্রমে তাকে অভ্যস্ত করে তুলতে পারে। পাশাপাশি গেমারের আচার আচরণকেও বিষিয়ে তুলতে পারে। অতীতেও অনেকবার এ রকম উগ্র গেম খেলা গেমারদের নানারূপ সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়াতে দেখা গিয়েছে।

আসক্তি সৃষ্টিকারক:
পাবজি গেম অতিরিক্ত খেললে এটা সত্য যে গেমটি আপনাকে সারাদিন ব্যস্ত রাখবে। আর এটাও ঠিক যে এই সময়ে আপনি লাভজনক কোন কাজ করতে পারবেন না। ভিডিও গেমে আসক্তি কোনো নতুন বিষয় নয়।

তবে আমাদের অবশ্যই আসক্তি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। কারণ ভিডিও গেমে আসক্তি আমাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

পাশাপাশি আমরা গেমের মূল্যহীন স্কোর অর্জনের জন্য আমাদের অমূল্য সম্পদ সময় ব্যাপকভাবে নষ্ট করি। যেটা বাস্তবজীবনে কোনো কাজেই আসবে না।

কিন্তু বর্তমানে ভিডিও গেমসগুলোর সফলতা নির্ভর করে এটা কত দক্ষতার সাথে মানুষজনকে আসক্ত করতে পারে তার উপর। আর পাবজি গেমেরও জনপ্রিয়তার কারণ এটা সব বয়সী মানুষকেই দারুণভাবে আসক্ত করতে পারছে।

ভয়টা এই আসক্তি নিয়েই। কারণ ছোটদের পাশাপাশি বড়দের ক্ষেত্রেও কোনও বাধা কার্যকর হচ্ছে না।

তবে, ছোটদেরকে এই গেম থেকে সরিয়ে নেওয়া গেলেও বড়দেরকে গেম খেলার আসক্তি থেকে ফেরানো অনেক কঠিন কাজ।

এক্ষেত্রে গেমার যদি নিজে তার গেম খেলার ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝে এবং নিজ থেকে বিরত থাকে, তবেই সম্ভব। না হয় আসলেই এটি অনেকটাই অসম্ভব।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া হ্রাস:
পাবজির মতো একটি অনলাইন মাল্টিপ্লেয়ার গেমে আসক্তির কারণে একজন মানুষ দিনে রাতে প্রায় সব সময়ই এই গেমটি খেলে তার মহামূল্যবান সময় নষ্ট করে।

তাই স্বাভাবিকভাবেই সে পরিবারের ও সমাজের অন্যদের সাথে সময় কাটাতে পারে না। বন্ধুবান্ধবের প্রয়োজনীয়তাও সে উপলব্ধি করে না। গেমটি এতই উত্তেজনাদায়ক যে যারা এই গেমে আসক্ত তারা সামাজিকভাবে মোটেই সক্রিয় নয়।

শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি:
এই গেমটি এতই আকর্ষণীয় আর আসক্তিকারক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে যে এটি প্লেয়ারদের একটানা খেলতে থাকতে বাধ্য করে।

অথচ একটানা মোবাইল বা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা কখনোই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। কারণ এটি কোনো শারীরিক পরিশ্রমের কাজ নয়।

তাছাড়াও এগুলোর দিকে একটানা তাকিয়ে থাকলে আপনার চোখও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটানা এইসব ডিভাইস ব্যবহার করলে মাথাব্যাথাও হতে পারে। এভাবে সারাদিন এসবের সামনে বসে থাকলে পিঠে ব্যাথা ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও হতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি:
শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতির পাশাপাশি পাবজি গেমটির আসক্তির ফলে চরম অবনতি হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যেরও। ২০১৮ সালে WHO (World Health Organization) ভিডিও গেমসে আসক্তিকে একটি মানসিক ব্যাধি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

আর পাবজিও একটি ভিডিও গেমস। ভিডিও গেমস অনেক মানুষের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতার একটি বড় কারণ। গেমের ফলাফল নিজের পছন্দ মতো না হলে একজন মানুষ সহজেই বিষণ্ণ হয়ে যেতে পারে।

ঘুমের ব্যাঘাত:
পাবজি গেমটা আপনার ঘুমেও ব্যাঘাত ঘটাতে সক্ষম। এমনকি ঘুমের সময় হলেও গেম শেষ না হবার কারণে আপনি ঘুমাতে চাইবেন না।

তাছাড়াও অনেকক্ষণ ধরে মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দার সামনে বসে থাকার কারণে আপনার সহজে ঘুম আসবে না।

যদিও আপনি অবশেষে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নেন। আর আমরা সবাই জানি যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ না ঘুমানোর কারণে মানুষ শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন ধরণের সমস্যায় আক্রান্ত হয়।

অন্যান্য কাজ করার সময় কমে যাওয়া:
আপনি যদি পাবজি গেমটা খেলে থাকেন, তবে আপনি অবশ্যই দেখেছেন যে একটা ম্যাচ শেষ করতে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা বা আরো বেশি সময় লাগে।

আর এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, খুব কমসংখ্যক মানুষই একটা ম্যাচ খেলেই থামে। আপনি যদি দিনে মাত্র ৫টা ম্যাচও খেলেন, তারপরও আপনি কম করে হলেও আড়াই ঘণ্টা সময় নষ্ট করবেন। যে সময়ে আপনি অন্যান্য দরকারি কাজ করতে পারতেন।

শেষ কথা:
“পাবজি” গেমটা সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে অত্যন্ত ব্যাপকভাবে। পাশাপাশি এই গেমে আসক্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে হু হু করে। গেমটাতে আসক্তি আপনার জীবনটাকে বিষিয়ে তুলতে পারে অনেক সহজে। আপনার কর্মজীবনের ক্ষতিসাধন করতে এই গেমে আসক্তিই যথেষ্ট।

যেইসব ছাত্র/ছাত্রীরা এই গেম খেলে, তাদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দিনদিন তাদের ফলাফল নিচের দিকে যাচ্ছে।

তাই সবারই উচিৎ এই ব্যাপারে সতর্ক থাকা, গেমটাতে আসক্তি পরিহার করা। নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলো শেষ করার পরই কেবল কিছু সময় পাবজি খেলার কথা চিন্তা করা উচিৎ।

মানুষ পাবজি গেম খেলার জন্য নিজের মাকে মারতে পারে ও বকাবাজি করতে পারে। এছাড়া অল্পবয়সীদের মধ্যে বাড়ছে হিংসা। ভার্চুয়াল জগতের মোহে তারা সরে যাচ্ছে বাস্তবতা থেকে।

সংবাদমাধ্যম জি নিউজের খবরে বলা হয়, জর্ডানে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল পাবজি খেলা। বিশেষ করে দেশের যুবসমাজের মধ্যে এই গেমের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। এই নিয়ে এর আগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল সেই দেশের টেলিকম কর্তৃপক্ষ।

মনোবিদদের দাবি, খেলার সময়ে অন্য খেলোয়াড়দের নৃশংসভাবে হত্যা করাই এই গেমের নিয়ম। এই ধরনের গেম-প্লে অল্পবয়সীদের মধ্যে হিংসার জন্ম দিতে পারে। আর এই কারণেই পাবজি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সাম্প্রতি এক প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, এখন পর্যন্ত পাবজি কত ইনকাম করেছে জানলে, চোখ কপালে উঠবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী পাবজি এখন অবধি ৩৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। এবং এর পরিমান জ্যামিতিক ও চক্রবৃদ্ধিহারে দিন দিন বেড়েই চলেছে।

সূত্র : ঢাকা ১৮

আরো দেখাও

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close