বছরে ২ হাজার কোটি টাকা ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে ক্যাবল অপারেটররা

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশে গত দুই দশকে টেলিভিশনে ক্যাবল সংযোগ মানুষের জীবনের অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ খাত থেকে খুব একটা লাভ করতে পারে নি সরকার।

ক্যাবল টিভি সংযোগের তথ্য গোপন করে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে ক্যাবল টেলিভিশন অপারেটররা।

বাংলাদেশে ক্যাবল অপারেটররা বছরে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করে।

সেই হিসেবে এই খাত থেকে বছরে ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হবার কথা সরকারের।

অথচ অপারেটররা দিচ্ছে মাত্র ৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরে এক বিরাট অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

বাংলাদেশ রাজস্ব বোর্ডের করা এক জরিপ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৩.৮০ কোটির বেশি ক্যাবল টিভি সংযোগ চালু আছে।

অপারেটরদের প্রতি মাসে সরকার নির্ধারিত ৩০০ টাকা করে ফি দেন ব্যবহারকারীরা।

সে হিসেবে প্রতি মাসে ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা আয় করেন ক্যাবল অপারেটররা।

মূসক আইন, সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি আইন এবং আয়কর আইন অনুযায়ী, সরকারকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট এবং আয়ের উপর ৩৫ শতাংশ হারে কর্পোরেট ট্যাক্স দেয়ার কথা তাদের।

কিন্তু গত অর্থবছরে এই খাত থেকে রাজস্ব এসেছে মাত্র ৮.৭৭ কোটি টাকা, যা এর আগের অর্থবছরের তুলনায়ও কম।

রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন এভাবে তথ্য গোপন ও ভুল তথ্য দিয়ে প্রতি বছর কোটি টাকা কর ফাঁকি দিচ্ছে ক্যাবল অপারেটররা।

এক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কিছু করার নেই বলে জানান তারা, কেননা ক্যাবল সংযোগের ব্যবসা পরিচালনা করে স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন লোকজন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, “ক্যাবল টিভি সংযোগের এই বিষয়টি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে এই খাতের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার”।

তিনি আরও বলেন, এই খাত থেকে সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় রাজস্ব সংগ্রহের বিষয়টি নিশ্চিত করতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রাজস্ব বোর্ড যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী।

ক্যাবল সংযোগের ব্যবসায় চলছে সেকেলে নিয়ম

বিশ্বজুড়ে স্যাটেলাইট টেলিভিশন ব্যবসা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্নীত করা হয়েছে। অথচ আমাদের দেশে এখনও সেই ৩০ বছরের পুরোনো পদ্ধতিতে চলছে এই ব্যবসা।

রাজস্ব বোর্ড এবং তথ্য মন্ত্রণালয় এই ব্যবসাকে ডিজিটাল পদ্ধতির অধীনে আনার চেষ্টা করছে।

এজন্য সেট-টপ-বক্স লাগানো এবং প্রতিটি সংযোগের জন্য আলাদা আলাদা সংযোগ নম্বর রাখার সুপারিশ করে রাজস্ব বোর্ড।

আর চলমান অ্যানালগ পদ্ধতির দ্রুত অবসানের কথাও বলেন তারা।

সেবার মানও সন্তোষজনক নয় 

দেশের বিভিন্ন অংশের ব্যবহারকারীরা অভিযোগ করছেন, বর্তমান ক্যাবল টেলিভিশনের সংযোগ নিতে বেশ চড়া সার্ভিস চার্জ দিতে হয় তাদের, অথচ স্পষ্ট ছবি দেখা যায় না, এমনকি পাওয়া যায় না পছন্দের চ্যানেলও।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা সালেহা আক্তার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানালেন, “নতুন সংযোগের জন্য ১৫০০ টাকা সার্ভিস চার্জ দিয়েছি। প্রতি মাসে ৪০০ টাকা করে দিতে হয় অপারেটরকে। অথচ অনেক ভালো ভালো চ্যানেলই দেখতে পাই না আমরা”।

“স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর সম্প্রচারের মাণো ভালো না।”

“শুনেছি, এলাকার প্রভাবশালী লোকজন এই ব্যবসা চালায়”।

এই অভিযোগের কোনটাই অস্বীকার করে নি বাংলাদেশ ক্যাবল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাব)।

ক্যাবের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এস এম আনোয়ার পারভেজ বলেন, “সরকারকে ট্যাক্স দিতে আমাদের কোন আপত্তি নেই।”

তিনি বলেন, এই ব্যবসায় ডিজিটালকরণ হলে অপারেটররাও উপকৃত হবে।

তবে প্রতি সংযোগের জন্য ট্যাক্স কমানোর দাবি জানান তিনি, কারণ “অধিকাংশ ব্যবহারকারীই মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের”।

অন্যদিকে, এই খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে হতাশ স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকরা। ক্যাবল সংযোগ ব্যবসাকে স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজনের দখলমুক্ত করার জন্য উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন তারা।

টেলিভিশন চ্যানেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অঞ্জন চৌধুরী বলেন, “দেশে এখন কতগুলো ক্যাবল সংযোগ চালু আছে সে সংখ্যা জানে না সরকার। কিন্তু ডিজিটাল করা হলে সেই সংখ্যা যেমন জানা যাবে, একই সাথে এই খাত থেকে রাজস্বের পরিমাণও বাড়বে।”

বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যাবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬ এবং ক্যাবল নেটওয়ার্ক লাইসেন্স আইন, ২০১০ এর অনুসরণে ক্যাবল সংযোগের ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।

আরো দেখাও

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close