বুধবার, অগাস্ট ৪, ২০২১

বাংলার বব ডিলান

অনলাইন ডেস্ক | আপডেট: শনিবার, ডিসেম্বর ১২, ২০২০

বাংলার বব ডিলান
সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় পশ্চিমা রক সংগীত করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন যে মানুষটি, তিনি মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান ওরফে আজম খান। বাংলার রক সম্রাট হিসেবেই যিনি সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত। ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পুরনো ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তী শিল্পী। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন অভিনেতা ক্রিকেটার ও মডেল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-আমেরিকার শীতল সম্পর্ক এবং ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রগতীর জোয়ারের প্রতীক যেমন হয়েছিল বব ডিলানের প্রতিবাদী গান; তেমনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে বিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষের হতাশার আশা হয়েছিল আজম খানের গান। ‘রেল লাইনের ওই বস্তিতে’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’ এমন অসংখ্য গানে সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠত।
বব ডিলানকে যদি বলা হয় পশ্চিমের হাওয়া বদলের পথিকৃৎ, তাহলে আজম খান বাংলার হাওয়া বদলের গুরু। কারণ দুজনই সংগীতকে ‘বিপ্লব’ এর নিরব অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার করেছেন।
শুধু কি গান? পরাধীনতার শেকল থেকে দেশকে মুক্ত করতে তরুণ আজম খান অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ৭১’এ যুদ্ধের ময়দানে। একা নন সঙ্গে জড়ো করেছিলেন বন্ধুদেরও।
সুদীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে দলেবলে পৌঁছান আগরতলা। সেখান থেকে মেঘালয়ে সেক্টর কমান্ডার পারভেজ মোশারফের অধীনে দু’মাস গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ঢাকায় ফিরে যাত্রাবাড়ী ও গুলশান এলাকায় গেরিলা তান্ডবে পাকিস্তানিদের ত্রাসে পরিণত হয়েছিল আজম খানের দল।
যুদ্ধক্ষেত্রে আজম খানের গান মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস জুগিয়েছিল। ভগ্ন হৃদয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের বিনোদনের একমাত্র খোরাক ছিল আজম খানের গান। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের লেখা ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে উঠে আসে অসীম সাহসী আজম খানের কথা। সেখানে তিনি লিখেন,
“২০ আগস্ট ১৯৭১। একটা তাঁবুতে আলো জ্বলছে। আর সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর: ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ’- বুঝলাম আজম খান গাইছে। আজম খানের সুন্দর গলা। আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা।”
এরপর বহুল প্রতীক্ষিত যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস রচনা করা এক বিধ্বস্ত বাংলাদেশের ছবি ভেসে উঠে আজম খানের চোখে। গণমানুষের কথা বলতে গানকেই উৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহার করেন। সে সময় অনেকে পশ্চিমা সংগীতের অনুকরণে ইংরেজী গান বাজনা শুরু করলেও গণমানুষের কথা বলা ‘রক’ সংগীতে ঝুঁকে পড়েন আজম খান। ১৯৭২ সালে বন্ধু শেখ ইশতিয়াক, হ্যাপি আখন্দ, ফকির আলমগীর, ফিরোজ সাঁই, ফেরদৌস ওয়াহিদকে নিয়ে গঠন করেন ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’। তখন থেকেই বাংলার লোক গানের পাশাপাশি পরিচিত হতে থাকে ভিন্ন ধারার এসব গান।
সে সময় যুব সমাজের কাছে আজম খান ছিল এক বিস্ময়ের নাম। স্বাধীন বাংলাদেশে উন্মুক্ত ময়দানে প্রথম রক কনসার্ট করে আজম খানের ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’। নটর ডেম কলেজের প্রগতিশীল কিছু ছাত্র মিলিত হয়ে আয়োজন করে এই কনসার্টের। মঞ্চে পপ, রক, এসিড রক, হার্ড রকের এক অপূর্ব মিশেল দেখতে পেল কনসার্টে উপস্থিত জনতা। আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি আজম খানকে। হয়ে উঠেন তরুণ প্রজন্মের আইকন। ‘গুরু’ ‘গুরু’ ধ্বনিতে কনসার্টে আওয়াজ তুলতে থাকেন ভক্তরা। হয়ে উঠেন বাংলা রক সংগীতের গুরু।
১৯৮২ সালে ‘একযুগ’ নামে আজম খানের প্রথম একক অ্যালবাম বাজারে আসে। ক্যারিয়ারে ১৭ টি একক অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন তিনি। এছাড়া ২৫ টিরও বেশি দ্বৈত ও মিশ্র অ্যালবামে গান করেছেন।
দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন পৃথিবীকে চির বিদায় জানান বাংলার এই রক গুরু।